আলোচিত সংবাদ

ব্যবসায়ীদের মা’থায় হাত, থার্টি ফার্স্টে জৌলুস হারাল কক্সবাজার

প্রতিবছর শেষ দিনে সূর্যাস্ত দেখে বছরকে বিদায় জানাতে উপচে পড়া ভিড় থাকে দেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারে। এবারও বছরের শেষ সূর্য অস্ত গেছে। কক্সবাজরও প্রস্তুত ছিল পর্যট’কের ভিড় সামলাতে। কিন্তু এবারের থার্টি ফার্স্টের সেই জৌলুসের দেখা মেলেনি কক্সবাজার সৈকতে।

সাগরপাড়ের হোটেল-মোটেল-রেস্তোরাঁ অনেকটাই ফাঁকা। নেই সড়ক-মহাসড়কে পর্যট’কবাহী যানের সারি। একপ্রকার স্তব্ধ বিচ এলাকা। অথচ থার্টি ফার্স্ট নাইট এবং শুক্রবারের সাপ্তাহিক ছুটিতে পা ফেলার জায়গা পাওয়ার কথা ছিল না সৈকতে।

লাখ লাখ পর্যট’কের পরিবর্তে ৭০-৮০ হাজার পর্যট’ক শুক্রবারের গোধূলিতে সৈকতে ২০২১ সালের শেষ সূর্যাস্তকে বিদায় জানিয়েছে। পর্যট’কের অনুপস্থিতি পর্যটন ব্যবসায়ীদের ভাবিয়ে তুলেছে।

কক্সবাজারের হতাশাগ্রস্ত পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, নানা কারণে এবারের থার্টি ফার্স্টে সৈকতে পর্যট’কের ‘মহামিলন মেলা’ বসেনি। প্রথমত করো’না পরিস্থিতির কারণে সৈকতে এবং প্রকাশ্যে যেকোনো অনুষ্ঠান আয়োজন নিষিদ্ধ আছে। এ কারণে দেশের নানা প্রান্তের পর্যট’ক তাদের ভ্রমণ কর্মসূচি বাতিল করেছে। দ্বিতীয়ত চট্টগ্রামের পতেঙ্গা ও পারকী’ সৈকতে লোকসমাগম বন্ধ করে দেওয়ার খবরে অনেকেই কক্সবাজার সৈকতেও একই আদেশ নিয়ে বি’ভ্রান্তির মুখে পড়ে শেষ মুহূর্তে কক্সবাজার যাত্রা বাতিল করে।

এ ছাড়াও সাম্প্রতিক কক্সবাজার সৈকতকেন্দ্রিক নারী ধ’র্ষণ এবং হোটেলে আ’ট’কিয়ে রেখে স্কুলছা’ত্রী ধ’র্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এসব অ’প্রীতিকর ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনভাবে নেতিবাচক প্রচারণা হয়েছে যে, অনেকেই ভ্রমণের প্রধান স্থানটি নিয়ে বিব্রতবোধ করেছেন।

স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীদের অ’ভিযোগ, সৈকতকেন্দ্রিক সংঘবদ্ধ স’ন্ত্রাসী দলের কারণেই কক্সবাজার পর্যটনকেন্দ্রের এখন বেহাল অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এত দিন স’ন্ত্রাসীদের বিষয়টি তেমন প্রকাশ পায়নি। কিন্তু এক নারী ধ’র্ষণের ঘটনাটি গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে আশিকের মতো ‘সৈকত স’ন্ত্রাসী বাহিনীর’ কথা চাউর হওয়ার পর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

এসব বিষয় নিয়ে কক্সবাজারের পর্যটনের হালহকিকত দেখভাল করার দায়িত্বপ্রাপ্ত অ’তিরিক্ত জে’লা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মো. আবু সুফিয়ান শুক্রবার রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কক্সবাজার সৈকতে ভ্রমণে আসা পর্যট’কের নিরাপত্তার বিষয়টিকে এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে জে’লা প্রশাসনের পক্ষে পাঁচজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পাঁচটি ভ্রাম্যমাণ আ’দালত ইনানী, হিমছড়ি ও কক্সবাজার সৈকতে কাজ করছেন।’

তিনি বলেন, “পর্যটনের স্বার্থে সাগরপাড়ের স’ন্ত্রাসী কর্মকা’ণ্ড বন্ধ করার জন্য প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। পর্যটনকেন্দ্রিক ‘সৈকত স’ন্ত্রাসী’দের চিরতরে উৎখাত করা হবে।”

কক্সবাজার সৈকতে দেশি পর্যট’কের বেহাল পরিস্থিতিতেও বিদেশি পর্যট’কদের আনাগোনা ছিল স্বাভাবিক। দুই দিন ধরে কিছু বিদেশি পর্যট’ককে সৈকতে দেখা গেছে। নিজেদের মতো করে সমুদ্রের পানি এবং বিচের রোদ উপভোগ করেছেন এই বিদেশি পর্যট’করা।

এ বিষয়ে কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পু’লিশের অ’তিরিক্ত পু’লিশ সুপার মো. মহিউদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাশিয়ান একদল পর্যট’ক ভা’রত ঘুরে এসেছে কক্সবাজার সৈকতে বেড়াতে। তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।’

শুক্রবার সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, থার্টি ফার্স্ট নিয়ে পর্যটন ব্যবসায়ীরাই সবচেয়ে ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বছরের শেষ দিনে যেহেতু প্রতিবছর লাখ লাখ পর্যট’কের ভিড় জমে সেহেতু ব্যবসায়ীরা পুরোদমে পুরো প্রস্তুতিও নিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু এ রকম ‘নিরানন্দ’ পরিস্থিতি হবে সেটা ব্যবসায়ীদের কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত।

সৈকতের ফটোগ্রাফার রুবেল জানান, তিনি বছরের শেষ দিন শুক্রবার পাঁচ-ছয় হাজার টাকা আয় করতে পারবেন বলে আশায় দিন গুনছিলেন। কিন্তু সন্ধ্যা নাগাদ তিনি পেয়েছেন মাত্র ৪০০ টাকা।

নিরিবিলি অর্কিড নামের রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার মৌলানা জামাল হোসেন জানান, গেল বছরের থার্টি ফার্স্টের তুলনায় এবার ৫০ ভাগ ব্যবসা কমে গেছে।

রোদেলা নামক একটি রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার মকবুল হোসেন বলেন, ‘গেল বছরের থার্টি ফার্স্টে আমা’র হোটেলে বিক্রি হয়েছিল এক লাখ টাকার বেশি। কিন্তু আজ (শুক্রবার) পুরো দিনে মাত্র ৩০ হাজার টাকা হয়েছে।’

কক্সবাজার সাগরপাড়ের হোটেল-মোটেল-রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাসেম সিকদার বলেন, ‘আমা’র আবাসিক হাটেলের ৬০ কক্ষের মধ্যে মাত্র ১০টি কক্ষ ভাড়া হয়েছে। আরো ৮-১০টি কক্ষের অগ্রিম বুকিং পর্যট’করা বাতিল করে দিয়েছেন। আমা’র রেস্টুরেন্টে অন্যান্য বছরের এমন দিনে দেড়-দুই লাখ টাকার ব্যবসা হতো। কিন্তু এবার ৩০ হাজার টাকার মতো হয়েছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছ, সাগরপাড়ের কেবল তারকা মানের হোটেলগুলো পর্যট’কপূর্ণ। এ রকম হোটেলের সংখ্যা হচ্ছে ১০-১৫টি। অন্য ৪৫০টি আবাসিক হোটেল-মোটেলে অন্তত ৫০ ভাগ কক্ষ খালি রয়েছে।

তবে কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবসায়ীদের আশা দেখাচ্ছে বিদেশি পর্যট’করা। তাদের নিরাপত্তার সব ব্যবস্থা করছে ট্যুরিস্ট পু’লিশ। এ ছাড়াও সকল পর্যট’কের জন্য কক্সবাজার সৈকতে নিরাপত্তা জো’রদার করেছে প্রশাসন।

কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পু’লিশের পু’লিশ সুপার মো. জিললুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিদেশি পর্যট’কদের বিষয়টি আম’রা ভালোভাবে দেখছি। তা ছাড়া সৈকতের নিরাপত্তাব্যবস্থাও জো’রদার করা হয়েছে।’ আকস্মিক এমন সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও পর্যট’কের সংখ্যা হ্রাস পাওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গেল সপ্তাহের তুলনায় পর্যট’ক কম এসেছে।

Related Articles

Back to top button
error: Alert: Content is protected !!